Menu

সত্যজিৎ রায়, বাংলা প্রবন্ধ রচনা, Best Unique 7 Points, PDF


সত্যজিৎ রায়
সত্যজিৎ রায়

সত্যজিৎ রায়, বাংলা প্রবন্ধ রচনা, Best Unique 7 Points, PDF

ভূমিকা

বিশ শতকের শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র নির্মাতাদের মধ্যে অন্যতম, বাঙালির গর্ব, অনন্য প্রতিভাধর সত্যজিৎ রায়-এর জন্মশতবর্ষে তাঁর অসাধারণ সৃষ্টিনৈপুণ্যকে নতুন করে উপলব্ধি করার ও তাঁর শিল্পকর্মকে প্রসারিত করে দেবার অবকাশ এসেছে। শিশু সাহিত্যিক, সংগীতজ্ঞ, চিত্রশিল্পী উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর পৌত্র ও খেয়াল রসের স্রষ্টা, ‘আবোল-তাবোল’-এর লেখক সুকুমার রায়-এর পুত্র সত্যজিৎ রায় সাহিত্যিক পরিমণ্ডলে তাঁর প্রতিভাকে বিকশিত করার সুযোগ পেয়ে তাঁর শিল্পকর্মকে বিশ্বের দরবারে ছড়িয়ে দিয়েছেন। বাঙালি হিসেবে এ আমাদের যথেষ্ট গৌরবের। তিনি অস্কার পুরস্কারপ্রাপ্ত আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চলচ্চিত্র পরিচালক ছিলেন।

জন্ম ও শিক্ষা

বর্তমান বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জ জেলার কাটিয়াদি উপজেলার মসুয়া গ্রামে অবস্থিত রায় পরিবারে সত্যজিৎ-এর জন্ম (কলকাতা, ২ মে, ১৯২১)। মাত্র তিন বছর বয়সেই তাঁর পিতৃবিয়োগ হওয়ার পর মা সুপ্রভা দেবী বহু কষ্টে তাঁকে বড় করে তোলেন। মা সুপ্রভা দেবী অবলা বসু পরিচালিত ‘বিদ্যাসাগর বাণীভবন বিধবাশ্রমে’ সেলাই করে সংসার চালাতেন। শৈশবের শিক্ষার পর তিনি বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক ও প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে অর্থনীতিতে অনার্স নিয়ে বিএ পাশ করেন। যদিও চারুকলার প্রতি তাঁর আজন্ম আকর্ষণ তাঁকে শান্তিনিকেতনের কলাভবনে যাওয়ার উৎসাহ যুগিয়েছিল। তিনি শান্তিনিকেতনে গিয়ে প্রাচ্যের শিল্পের প্রতি আকৃষ্ট হন ও চিত্রশিল্পী নন্দলাল বসু ও বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়-এর কাছ থেকে শিল্পকলা বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করেন।

চলচ্চিত্র

সত্যজিৎ-এর কর্মজীবন একজন বাণিজ্যিক চিত্রকর হিসেবে শুরু হলেও প্রথমে কলকাতায় ফরাসী চলচ্চিত্র নির্মাতা জঁ রনোয়ার-এর সাথে সাক্ষাৎ ও পরে লন্ডনে ইতালীয় চলচ্চিত্র – ‘বাইসাইকেল চোর’ (লাদ্রি দি বিচিক্লেত্তে) দেখার পর চলচ্চিত্র নির্মাণে উদ্বুদ্ধ হন। তিনি ৩৭টি পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনিচিত্র, প্রামাণ্যচিত্র ও স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। তাঁর প্রথম চলচ্চিত্র ‘পথের পাঁচালী’ (১৯৫৫) ১১টি আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করে। তাঁর ‘পথের পাঁচালী’, ‘অপরাজিত’, ‘অপুর র সংসার’, – একত্রে ‘অপু ত্রয়ী’ তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রকর্ম রূপে স্বীকৃত। 

আরো পড়ুন-  সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় প্রবন্ধ রচনা PDF

এরপর ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’, ‘চারুলতা’, ‘নষ্টনীড়’, ‘মহানগর’, ‘তিন কন্যা’, ‘অভিযান’, ‘কাপুরুষ ও মহাপুরুষ’ প্রভৃতি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। ছোটদের উপযোগী চলচ্চিত্র ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তাঁর অসামান্য সৃষ্টি। সত্যজিৎ তাঁর পিতামহ উপেন্দ্রকিশোর-এর – লেখা একটি গল্পের উপর ভিত্তি করে এই সঙ্গীতধর্মী রূপকথা নির্মাণ করেন। 

গোয়েন্দা কাহিনির উপর ভিত্তি করে ‘সোনার কেল্লা’ ও ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’ ছবি দুটি তিনি নির্মাণ করেন। হিন্দি সাহিত্যিক মুন্সী প্রেমচাঁদ’-এর গল্প অবলম্বনে তিনি ‘শতরঞ্জ কে খিলাড়ি’ চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। শোষক শাসকের স্বরূপ উদ্ঘাটনে তিনি নির্মাণ করেন ‘হীরক রাজার দেশে’। চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনার অসাধারণ নৈপুণ্য তাঁকে স্মরণীয় করে রেখেছে। পণ্ডিত রবিশংকর, বেলায়েত খান ও আলি আকবর খানের সাহচর্য তাঁকে চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনা ও নির্বাচনে সাহায্য করেছিল।

তিনি কয়েকটি উল্লেখযোগ্য তথ্যচিত্রও নির্মাণ করেছিলেন, যথা – ‘রবীন্দ্রনাথ’, ‘সিকিম’, ‘সুকুমার রায়’, ‘বালা’ এবং ‘দ্য ইনার আই’।

সাহিত্যকর্ম

চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়-এর সাহিত্যকর্মও অবিস্মরণীয়। গোয়েন্দা ফেলুদা, তারিনীখুড়ো ও বিজ্ঞানী প্রফেসর শঙ্কু তাঁর জনপ্রিয় চরিত্রসৃষ্টি। তাঁর ছোটগল্পগ্রন্থ গুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ‘একের পিঠে দুই’, ‘এক ডজন গপ্পো’ প্রভৃতি।

ফেলুদা ধাঁধার রহস্য উন্মোচন করে গোয়েন্দাগিরি করে। ফেলুদার বিভিন্ন গল্পে তার সঙ্গী লেখক জটায়ু ও তার ভাই তোপসে। প্রফেসর শঙ্কুর বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনিগুলি ডায়েরি আকারে লেখা। তারিণীখুড়ো জীবনে বহু অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে প্রৌঢ় বয়সে স্থিত হয়েছেন। সেই অভিজ্ঞতার গল্প তিনি কচিকাচাদের শুনিয়ে থাকেন। তিনি তাঁর ছোটবেলার কাহিনি নিয়ে রচনা করেছেন ‘যখন ছোট ছিলাম’। এছাড়া চলচ্চিত্রের ওপর লেখা তাঁর প্রবন্ধের সংকলনগুলি হল এককথায় অনবদ্য। 

সাংস্কৃতিক সত্তা

বাংলা তথা বিশ্বব্যাপী বাঙালিদের কাছে সত্যজিৎ রায় একজন আইকন। ভারতের বাইরে মার্টিন স্কোরসেজি, জেমস আইভরি, এলিয়া কাজান-এর মতো চিত্রনির্মাতারা তাঁর দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন। বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, মৃণাল সেন-এর মতো চলচ্চিত্র নির্মাতারা ভারতীয় চলচ্চিত্রে তাঁর অসামান্য অবদান স্বীকার করেছেন। নোবেলজয়ী সাহিত্যিক ভি এস নাইপল ‘শতরঞ্জ কে খিলাড়ি’-র একটি দৃশ্যকে শেকসপিয়রের নাটকের সাথে তুলনা করেছেন। 

আরো পড়ুন-  সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রবন্ধ রচনা PDF

পুরস্কার, সম্মাননা এবং স্বীকৃতি

সত্যজিৎ রায় তার জীবদ্দশায় প্রচুর পুরস্কার পেয়েছেন। তিনিই দ্বিতীয় চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব যাঁকে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় সাম্মানিক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করে। প্রথম চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব হিসেবে অক্সফোর্ডের ডিলিট পেয়েছিলেন চার্লি চ্যাপলিন। ১৯৮৭ সালে ফ্রান্সের সরকার তাকে সে দেশের বিশেষ সম্মনসূচক পুরস্কার the Legion of Honour-এ ভূষিত করে। ১৯৮৫ সালে পান ভারতের সর্বোচ্চ চলচ্চিত্র পুরস্কার ‘দাদাসাহেব ফালকে’ পুরস্কার। ১৯৯২ সালে মৃত্যুর কিছুদিন পূর্বে  আজীবন সম্মাননাস্বরূপ একাডেমি সম্মানসূচক পুরস্কার অর্থাৎ অস্কার লাভ করেন। মৃত্যুর কিছুদিন পূর্বেই ভারত সরকার তাঁকে প্রদান করেন দেশের সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান ‘ভারতরত্ন’। সেই বছরেই মৃত্যুর পরে তাকে মরণোত্তর ‘আকিরা কুরোসাওয়া’ পুরস্কার প্রদান করা হয়। 

উপসংহার

চলচ্চিত্র পরিচালক, প্রযোজক, চিত্রনাট্যকার, গীতিকার, সঙ্গীত পরিচালক, লিপি-কলাবিদ, অঙ্কনশিল্পী, সাহিত্যিক সত্যজিৎ রায় একজন অসাধারণ পান্ডিত্য ও ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন। পরিশীলিত মনন ও তীক্ষ্ণধীর অধিকারী সত্যজিৎ চিরকালই প্রগতিশীল ও আধুনিক মানসিকতার পরিচয় দিয়েছেন, যা যে কোনো বাঙালি তথা ভারতীয়র কাছে অত্যন্ত আনন্দের। তাঁর জন্ম শতবর্ষে (২০১৮ খ্রি.) আবার নতুন করে তাঁর শিল্পকর্ম ও ব্যক্তিত্বের মূল্যায়ন হবে ও তা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে হয়ে থাকবে প্রেরণাস্থল এবং অগণিত চলচ্চিত্র প্রেমীদের মণিকোঠায় উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।


সত্যজিৎ রায় সংক্রান্ত বাংলা প্রবন্ধ রচনা এখানে প্রকাশিত হল। ভালো লাগলে শেয়ার করতে ভুলো না। নিজেরা আরও তথ্য সংযোজন কিংবা বিয়োজন করে রচনাটিকে সমৃদ্ধ করে নিতে পার।

জীবনী ও মনীষী সংক্রান্ত আরও রচনা দেখতে ক্লিক কর


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!